Farhana Nasrin Lovely-1992

Farhana Nasrin Lovely-1992

Name: Farhana Nasrin Lovely

Father’s Name: 

Village: Elahinagar (East)

Batch Year: 1992

Study:  Six To Ten 

Blood Group: 

Occupation: Head Master, Govt. Primary School

Mobile : 

Email: 

Present Address: 

Website: 

Facebook

 

Biography:

 

অভিমান
~ফারহানা নাসরীন
একটি পলক দেখব বলে লক্ষ যোজন হাঁটি,
আমার জন্য বিছিয়ে রাখা কোথায় শীতল পাটি!
হৃদয়ে দুঃখ সাঁটি।
ফিরতি পথের প্রথম বাঁকেই পথের দিশা আঁকা,
নির্জনতার করাল করাত করছে এ বুক ফাঁকা।
রইল ছবি আঁকা।
মনপুরার ঐ চিলে কোঠায় চলছে অভিযান।
কোথায় স্মৃতির আঁশ বেঁধেছে, কোথায় অভিমান।
ঝাঁটছি সবখান।
ভালো থাকুক তাহার চারু, গোছানো সংসার,
তাহার সাথে হয় না যেন আমার দেখা আর।
ধারব না তা’র দ্বার।
হয়ত এটা প্রবোধ বচন, সবটা অভিমান।
মনের ভিতর দুখের কুয়া স্তব্ধ সুনশান।
ভাঙবে না এই মান।
.
.
চলিতেছে সার্কাস
~ফারহানা নাসরীন
২৮-০৮-২০২১ খ্রিঃ
আমি কিচ্ছু কমু না গো
কইলেই আমার দোষ,
তাই মুখ বন্ধ, চোখ অন্ধ
নইলে পড়ব অনল রোষ।
দলিল আছে স্কুল বন্ধের
খোলার তো আর নাই।
বড় বাবু গো, আপনার কাছে
পরিপত্র একখান চাই।
এই পত্র তো প্রেমপত্র না
দিতে বাঁধা কিসের?
লেখেন এইটায় স্কুলবন্ধ,
যাইতে হইব স্যার-মিসের।
ক্ষণে ক্ষণে কতই তো
পত্র আমাগো পাঠান,
টাইমস্কেল বন্ধ, ২য় শ্রেণিও
খাটানোর সময় তো খাটান।
সিদ্ধান্ত এইটা খুবই ভালা
সন্দেহ নাই একবিন্দু,
ওয়ার্কসিট দেয়া-নেয়া সহ
হাজার কাজের সিন্ধু।
স্কুলে বইসা কাজ করা যায়
নিরিবিলিতে খুব,
সময় মতন সব-ই হয়
জমেনা কাজের স্তুপ।
রি-ওপেনিং, রিকভারি আর
ওয়ার্কসিট মূল্যায়ন,
সংশ্লিষ্ট আরও কত যে কাজ
করতে হয় সমাপন!
এইসব কতা বিবেচনায়
স্কুলে যাওয়া ঠিক,
ছাত্র-ছাত্রী বিহীন বিদ্যালয়ে
নয়টা-চারটা কিন্তু বেঠিক।
অর্পিত কাজ করছে কিনা
ধরেন আইসা খুঁত,
হুদাহুদি বইসা থাকতে
লাগেনি কোনো যুৎ?
স্যার-মেডাম গো কইয়া দিছি
তজবি লইয়া আইবেন,
কাজ শেষে তজবি জপবেন
নেকি অনেক পাইবেন।
হোম ভিজিটের মাহাত্ম্যটা
করলাম অনেক খোঁজ,
গুগল মিট আর ফোনালাপ
চলছেই তো রোজ।
এর পরেও হোমভিজিট!
বেহুদাই এক চাপ,
স্কুলে আইসা ডাকি যদি
আসে ছাত্রের মা-বাপ।
কি জানি বাপু বুঝি না কিছু
ঘিলু তো মাথায় কম,
কী করলে যে কী হইব
ভাইব্বা বন্ধ দম।
মনেরে বুঝাই কি আর করা?
কবুল যহন কইছি-
হাজার কিলের পরও তাই
বেহায়া হইয়াই রইছি।
জীবন-যৌবন শেষ এইখানে
মায়া অনেক পড়ছে,
দিন যাউক, রাইত পোহাউক
দেখমু না কে কী করছে।
চিল্লায় বলেন,
কতা ঠিক কিনা?

 

 

সোনালী প্রেম
~ ফারহানা নাসরীন
এখন আর আমার ভালোবাসাগুলো
কৃষ্ণচূড়া হয়ে ফোটে না মধুপের চোখে।
ডানায় নেই শালিকের খুঁটে খাওয়া খাদ্য কণা সমান ব্যগ্রতা।
কেবল শাপলা চত্বরে বেদনা হয়ে লুটায়
দু’টি হাতের গাঢ় ছায়া।
পার্কের সবুজ গালিচা এখন নতুনের পদচারণায় মুখর।
সন্ধ্যা থেকে গভীর রাতোবধি চলে ওদের বেসুরা কণ্ঠে সুরার মাদকতা আর উলঙ্গ প্রেম।
অথচ এখানে এই নগরে আলো-আঁধারির সন্ধ্যায় জ্বলে
বেদনাময় নিয়ন বাতি।
এই অস্ফুট আলোতেই একদা আমরা স্বগতে আঙুলের ফাঁকে বুনেছিলাম ভালোবাসার বীজ।
আজ সেই আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে সাহারার হাহাকার।
বিঘোর বৃষ্টিতে আর হয় না ছাতার বেহুদা ভাগাভাগি।
বুড়িগঙ্গার নোংরা সলিলে সমাহিত করেছি সোনালী প্রেম-
কোন এক ঘনঘোর বরষায়। মন্যু গলে হয়েছে অশ্রু।
কত মিল বৃষ্টি আর অশ্রুতে, বর্ণে-গন্ধে এক।
কিছুটা পার্থক্য নির্ণিত হয় জিহ্বায় আর পারদের উঠানামায়। তখন সেসব ভাবার অবকাশ ছিল না। অনুভূত হতেই দু’ফালি হয়ে গেছে গর্ভবতী সম্পর্কের যকৃৎ। কার্জনহল সংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজ বেয়ে নেমে এসেছে কষ্টের বন্যা। অথচ এমনটি হবার কথা ছিলনা। কথা ছিল এইখান থেকেই শুরু হবে আগলে রাখার পরিখা খনন। আগলে রাখেনি সে, আগল তুলেছে আয়নার। অলখে আলগা করেছে প্রেমের বাঁধন।
এখন আমি ভেজাই চঞ্চু চোখের জলে
আর সে নুতনের পীন ঠোঁটের বায়বীয় চুম্বনে।
বৈশ্বানরে আমি ভুলের দাহ করি স্বপ্নের চিতায়। বিবেকের কাঠগড়ায় আজ দণ্ড মাথায় দণ্ডায়মান এই আমি।
অর্থদণ্ডের চেয়ে প্রেমের দণ্ড যে কতটা ভয়াবহ তুমি শেখালে ভীষণভাবে, মধুপ।

 

 

দশ খণ্ড কবিতা
~ফারহানা নাসরীন
১.
জাগতিক যা কিছু কামি
কোন কিছুই নয় দামী।
ত্যাগে সুপ্ত অসিঞ্চনীয় মহিমা
দানে ধন বাড়ে, বৈ কমে না।
২.
বিষয়-বৈভব আর যশ-খ্যাতি
ভাবনায় রয় যদি অবিরতি।
স্বস্তির দরশন হয় দূর দূরাগত
শান্তি উবে যায় কর্পূরের মত।
৩.
দৃষ্টির সীমা যদি হয় সমকোণ
জীবন অস্থির আর উচাটন মন।
দৃষ্টি নিবদ্ধ করো তব উপর-নিচে
লিপ্সা বাড়ে দেখে আগে-পিছে।
৪.
সব দেখা সব শোনা সদা সত্য নয়
ভাবনার অতীতও কভু সত্য হয়।
ভাবনার সায়রে যদি না-ই বা নামো
দাড়ি টেনে তাহলে এইখানেই থামো।
৫.
খুব বেশি কখনোই খুব ভালো নয়
মধ্যম সব কিছুই খুব ভালো হয়।
হোক সেটা ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা
সার্থক হয় না কভু ছাড় দেয়া বিনা।
৬.
পশু শাবক পশু হয় জন্মগত ভাবে
মানুষকে মানুষ হতে হয় স্বতন্ত্র স্বভাবে।
পশু-পাখি প্রয়োজনে শিখে দেখে দেখে
মানুষ এছাড়াও শিখে যদি যায় ঠেকে।
৭.
পরিশ্রম সাফল্য আনে আর সম্ভাবনা
ভাবনায় রোপিলে বীজ বাস্তবে জন্মে না।
পরগাছা জীবন নিজের কাছেই ভার,
নিরন্তর চেষ্টায় খোলে সম্ভাবনার দ্বার।
৮.
জিহ্বার স্বাদ নষ্ট পান আর চুনে
মনের শান্তি নষ্ট করে সন্দেহের ঘুণে।
পরচর্চা, পরনিন্দা, পরের সুখে কাতর
চিতা সম দাহ করে, জ্বলে অন্তর-গতর।
৯.
ধীমান আর ধনবানে নেই কোন তুল
ধনে-জনে সুখ আনে এ কথা ভুল।
অতি ধী, অতি ধন, অতি সব কিছু
অগ্রগতিকে কচিৎ টেনে আনে পিছু।
১০.
তুমি ভাবো সে সুখি, সে ভাবে তুমি।
ভাবনার ফসল এক কিন্তু ভিন্ন ভূমি।
জীবন জটিল করে অতি লোভী মন,
বৈষয়িক ভাবনা কভু মানে না বারণ।

 

 

কপাল!!!
ফারহানা নাসরীন
স্কুল বন্ধ, কাম-কাইজ নাই।
বইসা বইসা বেতন খাই।
বেতন নাকি আমাগো হালাল হয় না,
এই অপমান আর প্রাণে সয় না।
আইজকাল পথে-ঘাটে এমন কথা প্রায় শুনতে হয়।
পরিচিতদের সামনে পড়তে তাই লাগে ভীষণ ভয়।
সামনে পড়তে চাও না বাপু, সমস্যা কিছু নাই।
যেই কইরাই হউক, খোঁচানো তোমারে চা-ই।
মোবাইলটা আছে কোন দিনের জন্য?
অনলাইনেই খোঁচা মাইরা হমু ধন্য।
যেই বলা সেই কাজ।
ফেইসবুকে মারে স্ট্যাটাস।
“মাস্টরেরা ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া বেতন খায়!
কর্তাবাবুগো কি কোন বিবেক নাই?
বেতন কাটেন, স্কুল খুইল্লা দেন।
আজাইরা বসাইয়া বেতন দেন কেন?
কাম করে না, কাইজ করে না।
মনে মধ্যে যেন তাগো সুখ ধরে না।”
বলি ভাই, স্কুল বন্ধ কি আমরা করছি?
করোনারে কি দাওয়াত দিয়া আমরা আনছি?
শ্রেণিকক্ষ বন্ধ, স্কুল তো আর বন্ধ না।
প্রায়ই স্কুলে যাই দেখেন, অন্ধ তো আর না?
অনলাইন তথ্য আর অনলাইন ক্লাস
আমরা সব সময়-ই পাই ‘এ’ প্লাস।
বইয়ের চাহিদা, শিক্ষক তথ্য সব করি অনলাইনে।
তারপরেও জ্বলে কেন, আমরা পাইলে মাইনে?
পাওয়ার পয়েন্টেের ২০/২২ টা স্লাইড!
তৈরি করতেই যায় দুই-তিন রাইত।
ওয়ার্কসিট বিতরণ, উঠানে বইসা পাঠদান
করোনার সময়ও তো আমাগো-ই পাঠান।
মোবাইল হাতে দেখলে গাছের তলে
কেন যে আপনেগো শরীর এত্ত জ্বলে!
“ঐ দেখ্, নবাবের বেটা মোবাইল চালায়।
আজাইরা বইসা হারাম খাওন খায়।”
কপাল! নেটওয়ার্ক দূর্বল, সার্ভার ডাউন
এডাও কি আর আমাগো দোষ, কন?
অনলাইনে উপবৃত্তি আপলোড!
প্রচণ্ড শীতেও খোলতে হয় কোট।
নগদের প্যারায় তো এখন ঘরে থাকাই দায়!
“টেকা পাই নাই কেন স্যার?” ছাত্ররা জবাব চায়।
স্কুল জরীপ, স্লিপ প্লান আরও এপিএ চুক্তি
কোন কাজেই আমাগো আলস্য নাই একরত্তি।
জাতীয় দিবস আর অফিস আদেশ
এসবও তো করতে হয় শেষ।
গাছ লাগাই, পরিবেশ বাঁচাই – এসব কি দেখেন না?
কোন কাজটা যত্নের সাথে বলেন আমরা করি না?
অফিস থাইক্যা তথ্য দিতে স্যার-মেডামের তাড়া,
এক প্যারা শেষ না হইতেই আরেক প্যারা খাঁড়া।
স্কুল-টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা-দেখবাল করে কে?
তারপরেও পিছে লাগেন কাম কাইজ নাই, হে?
ঘরে যদি তাগো একজন প্রাইমারির মাস্টার থাকত,
খোঁচা মাইরা এসব কথা কইতে কি আর পারত?
স্কুল খুললে না যাই যদি, কইতে পারেন দুই কথা,
পরের সুখে কাতর হইয়া মরতাছেন কেন অযথা?

 

 

কৌঁসুলির তপশ্চর্যা
——-ফারহানা নাসরীন
তখন কেবল বটের পাতার ঝুনঝুনুনে বিকেল।
মৃদু আর বেগবানের মাঝামাঝি
মন কেমন করা উতল নভস্বান।
আমি তখন উড়ুক্কু মাছ।
জল-হাওয়া দুটোর উপরই আমার সমান অধিকার।
যা দেখি, যা ভাবি তার সবটাই ভালোলাগার।
বিকেলটা যেন দিনের যৌবন।
কোথাও সুখ নেই, আবার সবটা জুড়েই সুখের পশরা-
বাতাসের মত। যেন কৈশোরে আল দেয়া জমির
শুকনো মেটো পথে দৌঁড়োনো সুখের ব্যথা।
সেই বয়সটায় একজন বলেছিল,
“জীবনকে ভোগে বেহুশ করো না, উপভোগ করো।
জলে পায়ের সাথে মনও ভিজিও,
শুধু উষ্ণতা নয়- আগুন থেকে নিও উত্তাপ।
পাতার সবুজে গড়ো হৃদয়ের বসতি –
কেবল জ্বালানি নয়, পাতায় বানিও বাঁশরিও।
সে আরও বলেছিল,
প্রাসঙ্গিক আর ন্যায্য রাগ বেঁধে দিও কচ্ছপের পায়ে,
অনুরাগের স্থায়িত্ব হয় যেন হাওয়াই মিঠাই।
ছায়ার দৈর্ঘ্য মেপে মেপে করে নিও জীবনবীমা।
যেটা যা, শুধু সেটাই দেখো না,
গহিনের পথে জ্বালিও জ্ঞানের বাতি।
সত্যে হইও ব্রত, মিথ্যায় আপোষহীন।”
সেই থেকে আমার ডাইনিং-এ বিড়াল, ইদের বাজেটে পাতাকুড়োনি আর বার্গারে বসে যায়
ফুটপাতের ছেলেপুলের অধিকার।
সঞ্চয় যা তার সবটাই সমুদ্র, পাহাড় আর ঝর্ণার।
এখন আমি গাছের গুড়ির আকিঁবুকিঁতে দেখি
কোন ষোড়শীর অবয়ব।
দেহের বক্রতায় বিভক্ত করি না মানুষের-
কে নারী, কে পুরুষ?
রাগ-অনুরাগের সেই অমোঘ বাণী
আমি অক্ষরে অক্ষরে হয়ত নয়,
বাক্যে বাক্যে মানি।
আমি ঘুরে দাঁড়াই, মুষড়ে পড়ি না।
পতাকার দণ্ডের মত দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হই মিথ্যের।
শিঁয়াকাঁটার মত নত হই সত্যের পদতলে।
আমি ডরি না রক্তচক্ষু, নড়ি না সত্যের পথ ছেড়ে।
আমি মিথ্যার মুখোমুখি হই শাহাবাগে।

 

 

সমসাময়িক সমাচার
~ ফারহানা নাসরীন
৩১/৫/২০২১
হইতাছে কি চারদিকে!
করতাছে তারা কী?
গাছ তলায়, ঘরের পিড়ায়
বসছে মাস্টার জি।
সিঁড়ি কোঠা, বারান্দাও
বাদ রাখে নাই তারা।
কচিকাঁচা মুখগুলা সব
গরমে পাগলপারা।
ঘরে আমার ছোট্ট বাইচ্চা
ঘুমাইতে পারেনা শব্দে,
বৃষ্টি-গাদলায় বেহাল দশা
ঘর তো তাদের জব্দে।
পোলাপাইনের ক্যাচোরম্যাচোর
ভালা লাগে কি রোজ?
আফা আপনেরা অন্য কারো
বাড়িতে লাগান খোঁজ।
আপনেগো স্কুলে করোনা আছে
আমরা কি খুব শুচি?
চিপাচাপায় পড়ান বইসা
কেমন আপনেগো রুচি?
স্বাস্থ্যবিধি কইয়া কইয়া
খুব তো করছেন প্রচার,
ছয়-তিন ফুট দূরত্ব কই?
এক ফুটেতেই তো চার।
আপনেগো দেখলে হাসি পায় আফা
মায়াও লাগে খুব,
স্কুল রাইখা খুপরি ঘরে
পড়াইতে আসে কোন বেকুব?
কেউ তো আবার স্কুলের মাঠ
বাইচ্ছা নিছে পড়াইতে।
শ্রেণিকক্ষে সমস্যা কিগো
পড়া-লেখা করাইতে?
শ্রেণিকক্ষে আছে আলো-বাতাস
বেঞ্চ-টেবিলও পরিস্কার,
বাইরের মানুষ যায় না ঐখানে
না হইলে কোন দরকার।
আপনেরাই তো শিক্ষিত-সচেতন
স্বাস্থ্যবিধি মানবেন সব,
নিয়ম মাইন্যা স্কুল খুললে
স্কুলগুলা তো হইত সরব।
এমন কত প্রশ্ন যে রোজ
করতে হয় সম্মুখীন,
বীরের শির বুকে নামে
লজ্জাতে হই লীন ও ক্ষীণ।
প্রথম দিকে পাড়ার লোকে
জায়গা একটু দেয়।
পরের সপ্তায় বিছান পাটি
কাইড়াই প্রায় নেয়।
আমরা শিক্ষক জাতির বিবেক
বলে তো সবাই সবখানে,
এসে দেখেন জাতির বিবেক
কেমন আছে এইখানে।

 

 

একালের স্মার্টবয়
~ ফারহানা নাসরীন
১৬.০৫.২০২১ খ্রিঃ
স্মার্ট ফোন হাতে স্মার্ট বয়েরা,
যার হাতে ফোন নেই
ব্যাকডেটেড কয় এরা।
হাত চালু চোখ স্থির স্ক্রীনের ‘পর ,
ঘাড়খানা অবনত
পিতা-মাতায় নেই ডর।
টেক্সটবুক রেখে তারা ধরেছে ফেইসবুক,
অনলাইন ক্লাসের চেয়ে
গেইমসেই বেশি ঝোঁক।
মোবাইলটা চাইলেই মুখ-চোখে কালি খুব,
অনলাইনের বুঝো কিছু?
মা তুমি থাকো চুপ।
নিজের অজ্ঞতা ভেবে মা থাকেন গুটিয়ে,
ঘরে বসে থেকে থেকে
মেয়েটা গেছে মুটিয়ে।
আঙ্গুলে রকেট গতি, চ্যাট করে বাংলিশ
মোবাইলটা কেড়ে নিলে
হাত করে নিশপিশ।
স্ত্রীর সাথে প্যানপ্যান, দরজা কেন্ বন্ধ?
ছেলেটা ঘরে কি করে?
দেখো না কিছু, অন্ধ?
অনলাইন ক্লাস নয়ত বলে এ্যাসাইনমেন্ট,
সিগারেটের গন্ধ বুঝি
যদিও মারে প্রচুর সেন্ট।
বলে বলে ক্লান্ত আমি হয়ে গেছি শ্রান্ত,
ভাগ্যের ‘পর ছেড়েছি সব
চেষ্টা করে প্রাণান্ত।
কানে তার হেডফোন মুখে রা নেই কো
কারো সাথে কথা নেই
আত্মীয় আসলেও।
যদি কিছু জানতে চাই গুগলে নেয় আশ্রয়
বললে বলে, বোকা নাকি!
সময় করি সাশ্রয়।
একটা শব্দ খোঁজতে গিয়ে ডিকশনারি করেছি তন্ন
হাজার শব্দে চষার পরে
আমরা হয়েছি ধন্য।
যেভাবে ওরা জড়াচ্ছ নেটওয়ার্কের এই কবলে
বাপের নামটাও হয়ত
একদিন খুঁজবে এই গুগলে।
”অপারেশন সার্চ লাইট” নাকি ওটির সেই আলো,
বাদই দিলাম আমাদের
জাতীয় দিবসগুলো।
শিক্ষার নাম করে জড়াচ্ছে না তো কুশিক্ষায়?
আতঙ্কে কাটে দিনমান
হেলা নৈতিক দীক্ষায়!
এ ছেলে কি সেই ছেলে হাসিখুশিতে ছিল ভরপুর!
খিটখিটে-রুক্ষ কেমন
বিরক্ত ভাবে আদর।
মা-বাবা দিশেহারা, কী হবে তাদের আগামী?
দু’চোখে ঘুম নেই
সন্তান যে বিপদগামী।
মাঝেমাঝে মনে হয়, বন্ধ হউক অনলাইন শিক্ষা?
আগে তো কুত্তা সামলাও
চাই না তোমাদের ভিক্ষা।
ছেলে আমার মানুষ হউক নাইবা হল শিক্ষিত,
কি হবে এই শিক্ষা দিয়ে
রুচিই যদি বিকৃত!
জাতির ভালে এখন দূর্যোগের ঘনঘটা
ঘাড় নোয়া কুঁজো প্রায়
ভবিষ্যৎ প্রজন্মটা।

 

 

মননের এপিট ওপিঠ
~ ফারহানা নাসরীন
১০.০৫.২০২১
বল তো দেখি, মায়ের কোন ছেলেটা ভালো?
যেই ছেলেটা স্যুটেড-বুটেড সজ্জা জমকালো।
যেই ছেলেটা রুটিন করে মাসোয়ারি নেয় খোঁজ,
বছরান্তে বাড়ি এসে মায়ের করায় ভূরিভোজ।
যেই ছেলেটা মায়ের জন্য শাড়ি কিনে চিকন
হাজার টাকা না হলে দাম কি বলবে লোকজন?
ছেলে-মেয়েদের বাড়ি নেয় না মায়ের কথা ভেবে
সান্তনা দেয় দুষ্ট ওরা বিরক্ত তুমি হবে।
বৌমা তোমার শহুরে মেয়ে কেন তা তুমি বুঝনা?
আমি তো খোঁজ নেই-ই বলো, ওদেরকে তুমি খুঁজো না।
শোনালাম তোমার শরীর খারাপ, লক্ষণ নাকি করোনা?
দেখতে আসব? ব্যস্ততা কত যে নেই তোমার ধারণা।
যখন যা লাগবে ফোনে বলো সংকোচ একটুও করবেনা।
ভয় পেওনা সেরে যাবে সময় মতো খেয়ো খানাদানা।
ছোটকে বলব যত্ন নিতে, ঔষধ খাওয়াতে টাইম মত,
টাকার জন্য যেন চিন্তা না করে পাঠাব লাগে যত।
মায়ের চোখের তপ্ত লাভা গড়িয়ে পড়ে বুকে,
তবুও দোয়া বিধাতার কাছে থাকে যেন সে সুখে।
মায়ের ছোট্ট সাদামাটা ছেলেটি লেখাপড়ায় কম,
ভালো খাবার, দামী শাড়ি কিনে দিতে সে অক্ষম।
শাক-ভাত যা-ই খায় নিজ হাতে দেয় পাতে,
রাতের বেলা বিছানা ঝেড়ে শোয়ায় মাকে খাটে।
এই ছেলেটার মা ডাকের আগে বকা থাকে একটা,
বৌকে শাসায়, বাচ্চাকে বলে এগিয়ে দিতে লোটা।
নিজের হাতে জায়নামাজ পাতে মায়ের পদতলে,
পাগল প্রায় হয়ে পড়ে মায়ের কিছু হলে।
করোনা জেনে মায়ের থেকে যায়নি কভু দূরে,
জায়নামাজে বসে আল্লাকে ডাকে করুণ সুরে।
মায়ের কষ্ট লাঘব করো ওহে পরোয়ারদেগার,
মায়ের সকল কষ্টগুলো দাও না করে আমার।
ওগো আল্লাহ্ আমার জান্নাতটুকু নিও না তুমি কেড়ে,
কেমন করে থাকব আমি মাকে একলা ছেড়ে।
এই ছেলেটির অস্ফুটস্বর বাজে মায়ের কানে
বুকের জমিন যায় ভিজে যায় মায়ের চোখের বানে।
ওগো প্রভু শান্ত করো মন আমার যাদু সোনার,
তুমি রহিম তুমি রহমান দয়ার সাগর তোমার।
একই বৃন্তের দু’টি ফুল ভিন্নতা কেবল মননের,
বলো তো দেখি এই দুনিয়ায় জান্নাতটা কোন জনের?

 

 

মধুর বিধুরতা
~ফারহানা নাসরীন
০৫.০৫.২০২১ খ্রিঃ
কি লো মধু, পাঁচটা তো বাজে। উঠবি না?
ডাইল বোহাইছি, ডাইলটা একটু ঘুটবিনা?
অহনও গোসল করি নাই, কলপাড়ে লম্বা লাইন,
পিঁয়াইজ কাডি নাই, বাকী আছে ভাতও বোহাইন।
তুই একটু কর নারে বইন, শরীলডা বেশি ভালা না। কাইল্কা আমি করমুনে, আইজকেরটা তুই করস না।
খুপরি ঘরের ফোঁকর বাইয়্যা আলোর রশ্মি মুখে,
স্বপ্নরা সব চুঁইয়া পড়ে, মধুর রক্তশূণ্য চোখে।
কেমন কইরা বিয়া দিমু বইনের, বরটা হইব কেমন?
মায়ের অসুখ সারাইতেই হইব, সেই চিন্তাও তেমন।
পায়জামায় আস্তিনে হাত দিয়া দেখে কত টাকা জমলো,
চিন্তা হচ্ছে, নিজের জন্য যদি তা একটুখানি কমলো।
ঐ ছেমরি, ওঠ। কামে যাবি না? গরিবের ঘোড়ার রোগ!
ঘরভাড়া বাকী, শুইয়া শুইয়া করে অসুখেরে উপভোগ!
ওঠ।
হুশ ফিরেছে তখনই মধুর। চোখ ডলে আর কয়, জ্বর।
যাওনের সময় হইয়া গেছে? বইন, আমারে একটু ধর।
হ, সময় বেশি হাতে নাই। মুখটা ধো’, তাড়াতাড়ি কর।
দেরি হইলে বেতন কাটব স্যারে, বুঝব না তোর জ্বর।
কাঁচা মইচ আর ডাইল-ভাতটুকুন বক্সে ভইরা ল’,
হয়তার নুনের বাটিও খালি হইছে! ধার আনতাছি ব’।
ঝড়ে পড়া নৌকার লাহান টলতে থাকে মধু,
হাত বাড়াইয়া তীরে ওঠার প্রবল চেষ্টা শুধু।
নগর পথের জনস্রোতে ভাসছে মধু প্রাতে,
মাথা গিটার, শরীর হিটার হাঁটছে কোনমতে।
গার্মেন্টস গেইটের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা,
জিহ্বা-ঠোঁট গ্রীষ্মের মাঠ, খুব পেয়েছে তেষ্টা।
থার্মোমিটারের লেজার রশ্মি কপাল ছুঁতেই ওর,
১০৪ ডিগ্রি! দারোয়ান কয়, করোনা নাকি তোর?
মুহূর্তেই কারবালা হয় গেইট, সঙ্গীরা যায় দূরে।
একটুখানি পানি জন্য মধু ছটফটিয়ে মরে।
শতেকখানি মোবাইল আলোয় উদ্ভাসিত মুখ,
আরশপানে স্থির হল করুণ দু’টি চোখ।
চোখে ছলকায় অথৈ সাগর, কণ্ঠ মরুভূমি,
নিঠুর এই পৃথিবী, ভালো থেকো তুমি।
ভালো থেকো তুমি……..

 

 

তোমাদের এই নগরে
~ফারহানা নাসরীন
২৯.০৪.২০২১ খ্রিঃ
সুরুজ আলী থুক্ কইরা পানের পিক ফালাইয়া কয়,
কন তো দেহি, কোন হালায় এই শহরে রয়?
মুত্তেও নাকি পাঁচ ট্যাহা লাগে, আগতে লাগে দশ!
আমারে তোরা বোকা পাইছস? কি যে তোরা কস!
গাঁও-গ্রামের মাতবর আমি, থোরাই কেয়ার করি,
ছাতা খুইল্লা রাস্তার ধারেই মুতনের কামডা সারি।
বৌ-চামচা তো লগে নাই অহন, পিকদানি দিব কে?
ফুরুত কইরা ছাইড়া দিছি, সামনের দেওয়ালেই।
ঐ পোলা পলিথিনের ভিতর মুখ ঢুকাইছে কেন!
দামী কিছু লুকাইয়া খায়, নয় মনে হয় যেনো-তেন্!
পার্কে বইয়া জিরাইতে আমার ভালা লাগতাছে খুব,
সামনের বেঞ্চের ডলাডলি দেইখ্যা, নামাইয়্যা রাখছি চোখ।
হাইন্জা হইতেই মাইয়্যাগুলান কেমনে জানি চায়।
একজন আইয়্যা কইয়াই ফেলল, কেমন চায় চাচায়?
আস্তাগফিরুল্লা নাউজুবিল্লাহ মাইয়্যা কয় কি এইডা?
বাপের সমান বয়স আমার, ক্যামনে কইলা কতাডা?
চাচা, কত বুড়া দেখছি আমরা পুরাই তাদের তেল,
ট্যাহা থাকলে কিসের বয়স, মাথা হউক টাউক্কা বেল।
পেডের ক্ষুধা লাজ মানে না গো, থাকে না ডর ভয়,
ঐ সব তো থাকে মধ্যবিত্তের, ধনীদেরও তা নয়।
আমরা যা করি পেডের দায়ে গাড়ি-ঘোড়ার চিপায়,
ঐ কামডাই ধনীরা করে হোটেল বা ফ্ল্যাটের তলায়।
হেগরে কিছু কওনের সাহস আছে কি আপনার, কন?
তয় আমাগো কেন এতো ঘেন্যা করে নগরের জনগণ?
অত কতা কওনের বেইল নাই চাচা, লাগবনি তা কন?
হাসপাতালে রাইখ্যা আইছি মা আর ছোট্ট বইন।
কি হইছে তোমার মায়ের, নাকি হইছে তোমার বইনের?
আমারে যদি খুইল্লা কইতা, কতা আছে যত মনের।
সাহায্য আনতে গিয়া মা পৃষ্ট হইছে, বইনে নির্যাতিতা,
এই ব্যবসায় নতুন আইছি গো চাচা, কি আর কমু তা?
বিচার দাও নাই অপরাধীর, কোনো মুরুব্বির কাছে?
আমাগো বিচার করব তারা, হেই সময় কি আছে?
তয় চাচা গেছিলাম একজনের কাছে, বিচার যদি পাই,
আমারে দেইখ্যা হেই মুরুব্বি যেন চোখে গিল্লা খায়।
আমারে কয়, বিচার অইব তার, ট্যাকাও পাবি বেশ,
এক রাইতের লাইগ্যা যদি আমারে তোর শরীরটারে দেস।
কও কি মা! বিচারক কইলো তোমারে এমনতর কতা?
সমাজ তো দেহি পইচ্চা গেছে, বিগড়ায় গেছে মাথা।
চাচা,পেডের ক্ষুধায় ডাস্টবিন থাইক্কা খাইছি কত খাবার
পেডের দিকে চায় নাই কেউ হুক খুলতে চাইছে জামার।
ফুটপাতের পাশে রাইতের বেলা ঘুমাইয়া পড়তাম যহন,
শুয়োর কয়ডা আমারে তুইল্লা নিয়া খাবলায় খাইত তহন।
ওরা কিন্তু ট্যাহা দেয় নাই, ঐডা নাকি ফুটপাতের ট্যাক্স।
সঙ্গীরা আমারে বুঝাইয়া দিছে সব নগরের মারপ্যাঁচ।
রাইতে অহন ঘুমাইনা আমি, ট্যাহা কামাই খুব জাইগ্যা।
দিনের বেলা ঘুমের মধ্যে হাত ছোঁয়াইলেই যাই রাইগ্যা।
জবেনূর থাইক্কা জেবিন হইছি, ট্যাকাও হইছে মেলা
রোজ রাইতেই দেহি এমন জীবন বদলের খেলা।
সুরুজ আলীর চক্ষু বাইয়া বইছে জলের ধারা,
নগর জীবন এত্ত কষ্টের বুঝতাম না আহন ছাড়া।

 

 

আত্মপ্রচার করি না
~ ফারহানা নাসরীন
আমি আবার ভাই অন্য রকম
আত্মপ্রচার তেমন করি না,
ডাল ভাত খেয়ে ভালই আছি
টাকার পাহাড় গড়ি না।
ব্যাংকে নেই ব্যালেন্স তেমন
সঞ্চয়পত্র আছে কেনা।
ব্যাংকের কাছেই কোটি টাকা
আমার আছে ভাই দেনা।
বাসন, গ্লাস আর গামছার মত
গাড়িও আমাদের আলাদা,
ছেলেকে দিয়েছি ল্যাম্বারঘিনি
মেয়ের বুগাত্তি ভেরন-সাদা।
আপনার ভাবি তো মিত্যব্যয়ী,
তেমন কিছু তার চাওয়ার নাই।
প্রতিমাসে দু’লাখেই চলে
এ আর কি খুব বেশি, ভাই?
যাকাতের কথা কি বলার মত কিছু!
এ তো গরিবেরই হক,
আমার বাড়িতে যাকাত নিতে এসে
প্রতিবারই তো মরে গোটা কয়েক।
নাইট ক্লাব থেকে ফেরার পথে
তাহাজ্জুদটা পড়ি মসজিদে,
ফজরটাও কোনদিন কাযা করিনি
যোহর ওয়াক্তে যদিও থাকি ঘুমে।
স্কুল কমিটি বলছে সভাপতি হতে
তাহলে তো গচ্ছা দিয়েই হবে মরতে,
মসজিদ মাদ্রাসার সভাপতি আছি ঠিক
ভাববেন না কালো টাকা সাদা করতে।
জায়গা কিনে আবার বাড়ি বানাব!
এত্ত টাকা আমার নেই ভাই?
উত্তরার এক বিঘা আর পূর্বাচলের পাঁচ
সবই ডেভলপারকে দিয়েছি তাই।
লেখালেখিতে আগ্রহ আছে প্রচুর
লাভ লেটার লিখেছি কয়েকটা।
এখন চেকে স্বাক্ষর দিতে দিতেই
তেজপাতা হয় জীবনটা।
করোনা এসে যে কি ঝামেলা হল
হাতে নেই টাকা কড়ি,
সুইস ব্যাংকে নক করতেই হবে
নয়ত, অনাহারেই যাব মরি।
বয়স তো আর কম হল না,
ভাবছি হজ্বটা করেই ফেলব।
কাবার ঘরে মাথা ঠুকে ঠুকে
নিষ্পাপ হয়েই মরব।

 

 

নগদের নগদ প্যারা
~ফারহানা নাসরীন
শিওর ক্যাশের শুভ বিদায়
হইছে তো ভাই ঠিকই,
নগদের যে এত্ত জ্বালা
জানতাম আমরা তা কি!
নগদ পোর্টালের জটিল জালে
আটকাইয়া গেছি আমরা!
মনেরে কই, নিজেই নিজের
হাত-পা গুলি কামড়া।
শুধুই কয় ওয়েট করুন,
কার জন্যে করমু ওয়েট?
প্রেমিক হইলেও কথা আছিল
বইয়্যা থাকতাম হইয়া টাইট।
প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য যদি
এত্ত ওয়েট কেউ করত,
সবার প্রেমই ধন্য হইত
কত তাজমহল যে গড়ত!
লগ আউটের ভীষণ প্যারায়
মাথাখান হইছে আউলা,
মনে লয় দেশান্তর হই-
ডুগডুগি হাতের এক বাউলা।
স্বামীর চেহারা ভুইল্লা গেছি
মাইয়্যারে কই, তুমি কে?
মাইয়্যা জড়াইয়া ধরলে কই,
কাইন্দা বাঁচি, মা ছাইড়া দে।
ঘড়ির কাঁটা ১ টা ছুঁইছুঁই
চোখের কোণায় অনেক ঘুম,
স্ক্রীনের লেখা ঝাপসা দেখি
লেখা দেখি কইরা জুম।
বিজ্ঞজনেরা কন না একটু
বুঝাইয়া-শুনাইয়া কর্তাদের,
ধীর সুস্থে করমু সব কাম
সময় বাড়াইয়া দেউক মোদের।
সেই সুযোগে সার্ভার ডেভলপ
করতে পারবেন ওনারা,
ছাত্র-ছাত্রীর অসম্পূর্ণ তথ্যও
যোগাড় কইরা ফালামু আমরা।

 

 

সায়াহ্নের ছায়া
~ফারহানা নাসরীন
জীবন যেখানে ক্ষয়ের,
সুখ সেখানে লয়ের।
পলাণ্ডুর পরত যেন জীবনেরই ভাঁজ।
যা কিছু শুভময়,
তা কখনও একার নয়।
সকলে সকলের তরে-উন্নততর কাজ।
অন্তরতম কেউ কারো নয়,
নিজেকে ভালোবাসতে হয়-
অহম-ঈর্ষা-দ্বেষের ধুলো ঝাড়ি।
অতলের তল খোঁজা,
দূর্বোধ্যতাকে বোঝা-
এহেন কর্ম সব দৃশদ্ ভারি।
অস্তিত্বের সময়কাল,
সে বড় বেসামাল।
প্রদোষের কালবেলায় অতি হাহাকার।
দম্ভের অপনয়ন,
শুভ বাক্য চয়ন-
প্রীত তব নিয়তির কল্যাণেষু লিপিকার।
ঋদ্ধ কুহকী যৌবনে,
বিস্রস্ততা দেহ মনে-
রীপূর বিষাক্ত বানে ভরা পবিত্র তূণ।
পরমকে গিয়ে ভুলি,
তুচ্ছকে মাথায় তুলি-
বাড়িয়েছি দিনেদিনে জীবনের ঋণ।
কুঞ্চিত গাত্র চর্ম,
বিম্বিত সকল কর্ম-
অক্ষিপটে স্যালুলয়েড ফিতার মতন।
নৈঃশব্দের নৈসর্গ,
কমেছে জীবনের অর্ঘ-
উন্নিদ্র যাপিত অস্বস্ত-অহেতুক জীবন।
এ বেলার ব্যর্থ বিলাপ,
চক্ষু’পরে ভ্রান্ত গিলাফ।
সত্যের প্রাচুর্য গিয়েছে ঢাকা পড়ি।
ক্লান্ত-শ্রান্ত মনোপেশি,
পারে না সরাতে বেশি-
ভুলের বোঝাখানি আছে মাথা ভরি।
জগতের মোহময়তায়,
নেই কারো কোন দায়।
জীবনের হিসাব চুকাতে হয় শুধু একার।
প্রিয়জন, কত আপনজন,
নিমিত্ত কেবল প্রয়োজন।
বেলাশেষে সম্পর্ক সব চোখের দেখার।

 

 

নিদারুণ দিব্যি
~ফারহানা নাসরীন
তুই আমারে কষ্ট দিবি,
এত্ত সাহস তোর!!!
মনের ঘরে তালা দিছি
বন্ধ কইরা দোর।
কপাল জুইড়া আঁকছি তাই
প্রতিবাদের টিপ।
চক্ষু মেইল্যা চাইয়্যা দেখিস
জ্বালাইয়া মনের দীপ।
অপমানের শোকের গন্ধে
প্রতিশোধের ফোঁড়ন,
সুবাস জানাইতে মাঝেমধ্যে
খুইল্যা দেই সব তোরণ।
কি ভাবছস তুই, মইরা যামু?
ভাইব্যা ভাইব্যা তোরে?
মাথা নষ্ট! পাগল নাকি!
কাতরামু তুইতুই করে!
বুঝার আগে ফুলের মতন
গুঁইজ্যা রাখতাম খোঁপায়,
এখন তো তুই ময়লা কাপড়
নিয়ে গেছে ধোপায়।
মনের ঘরের কোন ছিকাতে
স্মৃতি আছে তোলা?
মুছতে স্মৃতি, ফেলতে কষ্ট
দরজা রাখি খোলা।
আমার মনের সবটা জুইড়া
চলছে অভিযান,
একটুখানি কষ্ট হইছে
পাইতে পরিত্রাণ।
কানে ধইরা করছি শপথ
এমন ভুল আর নয়,
শাসন করমু মনটারে খুব
তোর কথা যদি কয়।

 

 

সমসাময়িক এই সময়
~ফারহানা নাসরীন
কি আজব রে বাপ!
তলোয়ারটা যেমন তেমন
বেশ বড় তার খাপ।
ঠাটে বাটে প্রকাশ করে
রাজার হাতের অসি,
ঝকঝকে সেই খোলসেতে
নিরাপদে থাকে পশি।
কাজের সময় বের করা দায়
আটকে থাকে খাপে,
খোলস যে তার ভীষণ বড়
সঠিক নয় যে মাপে।
কাকও এখন গোল্ড মেডেলিস্ট,
কণ্ঠ যা তা-ই হোক,
বেসুর যদিও, উচ্চ স্বর তো
চুপ কোকিলের মুখ।
প্রচারেতেই যে প্রসার ঘটে
কাক বুঝে তা বেশ,
কা কা করে চেঁচিয়ে মাতায়
সুরের নেইকো রেশ।
বাঘ চাটে আজ শেয়ালের পা
গাধা চড়ে ঘাড়ে,
মুলার চেয়ে ধেরা বড়
সবার নজর কাড়ে।
অল্প পানির চিংড়ি মাছের
ছাটুর ছুটুর খুব।
কাদার বাইনের গোতলানিতে
আঁতকে ওঠে বুক।
ইলিশ মাছ জাতীয় তবুও
গভীর জলে থাকে।
কালো শিং পিচ্ছিল চতুর
কাটা ফুটায় ফাঁকে।
চড়ুই পাখির ফুরুত ফারুত
উটপাখির ধীর চলা।
বাবুইপাখি শিল্পী তবুও
শকুনের দীর্ঘ গলা।
বাবুই পাখি ছোট্ট বলে
অলক্ষ্যে রয় সবার।
শকুন বড় এই কথা ঠিক
আস্তানা তার ভাগাড়।
পুঁটির সাথে দার্কিনার লাফ
ধরাকে করে সরা,
রুই কাতলের আবাসগুলো
চুনোপুঁটিতে ভরা।
বাঘগুলো সব খাঁচায় বন্দী
শিয়ালের শোরগোল,
মিউমিউ বাঘের হুংকার
হুক্কাহুয়ার জোর।
শিয়াল কি আর ঢুকবে গর্তে,
নিজস্ব যেই ঘর?
আবার কবে খুলবে বাঘের
বন্ধ খাঁচার দোর?

 

 

আহ্বান
~ ফারহানা নাসরীন
আকাশ পেতে বসে আছে রূপোর থালা এক,
জলের পরে পাত পেড়েছে, দেখবি এসে দেখ।
সবুজ পাতায় রূপোর ঝিলিক, খুশির লুটোপুটি,
জোনাক পোঁকার ঝিঁঝিঁ ডাকে নিদ গিয়েছে টুটি।
চাঁদ যদিও কলঙ্কিনী, রূপে সুধার ধারা,
সাধ্য কি আর আছে এমন, চক্ষু মুদতে পারা?
এমন রাতে জোৎস্না হোলি মাখবি কে রে আয়,
ফুলের রেণুর পরাগ মেখে কোমল দু’টি পায়।
আবিষ্ট এই পরাণ পাখি মনের গহিন গাঁয়,
ছটফটিয়ে ক্লান্ত অতি বদ্ধ পিঞ্জিরায়।
আয় রে তোরা আয়, চাঁদ যে ঢলে যায়,
অক্ষিপটে রাখবি ধরে, নাইবি জোছনায়।

 

 

মাগো মা
——ফারহানা নাসরীন
আজ বিকেলের উদাস করা
মায়ের দু’টি চোখ,
গ্রীলটি ধরে রয় তাকিয়ে
বাড়িয়ে তাঁর মুখ।।
কোথায় তাঁর সোনা-জাদু
কোথায় আপনজন?
ঝাপসা চোখে খোঁজে তাদের
অবুঝ-ব্যাকুল মন।।
হু হু করে বুকের মাঝে
অভাগিনীর তরে,
একলা ঘরে রয় সে বসে
সবাই থাকি দূরে।।
নিজের কাজে দিনমান যায়
যে যার মতো রই,
মায়ের মনের অভাবখানি
আমরা দেখি কই?
খোর-পোষের নেই চাহিদা
শূন্যতা তার বুকে,
আপনজনের সঙ্গ মাগে
ব্যাকুল দু’টি চোখে।।
মায়ের গলায় হাতটি রেখে
যখন আমি শুই,
আকুল হয়ে বলে তখন
যাসনে মাগো তুই।।
কষ্টে আমার বুক ফেটে যায়
দু’চোখ ভরে জলে,
প্রবোধ আর সান্তনা দেই
আসবো আবার বলে।।
“একলা আমার ভাল্লাগেনা”
বলে কাতর স্বরে,
“তোরা আমার পাশে থাকলে
মনটি থাকে ভরে”।।
যে দিন তুমি থাকবেনা মা
শূন্য হবে ঘর,
ছিন্ন হবে হৃদের বাঁধন
আপন হবে পর।।

 

 

শেষ বিকেলের আলোয়
~ফারহানা নাসরীন
লখিন্দরের বাসরের মত মনে
কোন ছিদ্র সে রাখেনি অবিশ্বাস প্রবেশের।
তবুও নিয়তির মতই সর্প ঢুকেছে বাসরে,
মনে জেগেছে অবিশ্বাসের চোরা চর।
কখনও জাগে, কখনও বা আবার
স্মৃতি ভরা তিথির জোয়ারে ডুবে যায়।
সে বলেছিল, বাবা-মায়ের চাপ।
আমি দেখছি স্বেচ্ছায় মাল্যদান।
তার চাহনির উপচে পড়া সুখ অন্তত তাই বলে।
তার নাইয়রের নাও এখন আমার চোখের জোয়ারেই ভাসে।
চোরা চরে আটকে গেলে ফলবতী সে আর সেই নাও,
তার সুঠাম দেহরক্ষী শোলার ভেলা হয়ে আসে।
আমি ডুবো চরের দখলি জমির লাল নিসান হয়ে
কেবল দেখি-তার নির্মোক হওয়ার দৃশ্য।
গিরগিটি তাকে দেখে অবাক হয়ে, একবার তার দিকে আরেকবার নিজের দিকে তাকায়।
এখন আর কথায় কথায় তার ভ্রমর চোখের কাজল গলে না,
কেবল কপালের সিঁদুর টিপ লেপ্টে হয়ে যায় ভোরের সূর্য।
সদ্য স্নানের জলকণা লজ্জা হয়ে জমে থাকে ওষ্ঠা’পরে।
কেননা দেহে-মনে তার উপনিবেশের ঘাঁটি গেড়েছে নতুন মানুষ।
মসলিনের কারিগরের কেটে নেয়া হয়েছে হাত।
বর্গা জমিতে চলে নীলের চাষাবাদ।
শেষ বিকেলের আলোয় ঝাপসা চোখে আমি দেখি
তার এবং তাদের স্বপ্নের বেসাতি।

 

 

তোমাকে বলছি
~ফারহানা নাসরীন
অতটা সুখ আমি তোমাকে পেতে দিব না,
যতটা দুঃখী হলে আমি- খুশি হও তুমি।
অতটা দুঃখও দিব না তোমায়,
যতটা পেলে দেবদাস হয়ে বিখ্যাত হওয়া যায়।
৭ মার্চের ভাষণের মত বলব না,
ভাতে মারব, পানিতে মারব।
তুমি মরবে আমার অবহেলায়, অযোগাযোগে।
চোখের জলের একটি কণাও হবে না তোমার জন্য।
তোমার প্রেম হতে দিব না ধন্য।
কারণ, তুমি বন্য।

 

 

প্রবঞ্চক
~ফারহানা নাসরীন
জীবনের শুখো কালে
তুমি মিকাঈলের আদেশ হলে বক্ষে।
সায়র হল অথৈ সাগর
প্রণয়ের হানা হলে হৃদয়ের গবাক্ষে।
আঁখি পল্লব নির্মিশেষ তবু
মন ও মস্তিষ্কের তুমুল রায়ট চলে অহর্নিশ।
পরাজিত সৈনিকের মত, আমি
হাত উঁচিয়ে তাই বিজয়ীকে করেছি কুর্ণিশ।
কিছুটা আততায়ীর আদলে
বিষাক্ত তীর ছুঁড়ে মারলে গহীনের গভীরে।
আহত শম্বরসম এই আমি
পালাতে চেয়েও ধরাশায়ী রক্তাক্ত শরীরে।
তোমার উপরোধ আদেশ হল
বিরাগী জোৎস্না হল সওগাত জীবনের।
প্রবল জোয়ারে গেল ভেঙ্গে
বাঁধানো তট, নাব্যতা বাড়ল যুগল প্রেমের।
আমি যখন বেহুশ হাবুডুবুয়,
তুমি তখন বজরায় আসীন দক্ষ সওদাগরের।
মনের বেসাতি সেরে সুরে
তুমি, লেফাফা তুললে আবদ্ধ তাম্ঞ্জামের।
প্রদোষের আবছায়ায় আমি
ফণীর নির্মোক হতে দেখে স্তব্ধ নির্বিকার!
অনুনয় অনুশোচনা হল,
মুক হল মুখ আর অস্ফুট হল চিৎকার।

 

 

বায়ু ও বিশ্বাস
~ফারহানা নাসরীন
বিশ্বাস ঠিক বায়ুর মতন
যায় না ধরা-ছোঁয়া।
সর্বত্র বিরাজ তবু
অলক্ষ্যেতে রোয়া।
উপস্থিতি টের পাওয়া যায়
অনুপস্থিতি ঢের বেশি।
হতাশায় নূব্জ্য তাই
ক্লান্ত মনোপেশি।
বায়ু অভাবে শ্বাসকষ্ট
টান পড়ে তাই নিঃশ্বাসে,
বায়োবীয় এই দু’টিতে
মনোকষ্টের দায় বিশ্বাসে।
বায়ু স্বার্থক নির্মলতায়,
পর্যাপ্ততায় মেলে সুস্থতা।
বিশ্বাস বাঁচাতে তেমনি করে
জন্মাতে হয় দৃঢ় আস্থা।
অনেক ভুলের পঙ্কিলতায়
নিমজ্জিত যেই এ অন্তর,
বন্ধুর পথে বন্ধুর হাত
লাইফ সাপোর্টের নামান্তর।
বিশ্বাস এক অনুঘটক
ভালো থাকার নিয়ামক,
ভালো থাকার, রাখাতেও
বিশ্বাসই হয় খুব অমোঘ।

 

 

জলনিধি
~ফারহানা নাসরীন
ওগো পারাবার, তোমার শতধায় মগ্ন সবাই
চিত্তে আহ’রে শমতা।
কেহ দেখে কঙ্কর আর কেবলি প্রপা-বালি
কেহ দেখে বিয়ৎ বন্ধুতা।
বর্ণক বাখানে বিরাজে তব বৈভবও প্রতুল,
বিভা আর পবিত্রতা।
বহুধা মহার্ঘে বলয়িত তুমি, গহিনে তোমার
রত্নকন্দল পূর্ণতা।
তুমি দেবখাত বিধাতার, উপমা বিশালতার,
সূতিকাগার বারিদের।
তব দাতব্য দাক্ষিণ্যে পূর্ণতা পায় বিটপী,
আসে জীবিকা কৈবর্তের।
ভক্ষ্যে ভরা তুমি-সংগুপ্ত সম্ভার, আর
নির্ধনের ধন-আধার।
জলনিধি, মূর্তে তুমি তেজস্বী ও রাগাল
বিমূর্তে অতি উদার।
আশ্চর্য তুমি, আচার্য তুমি! তোমা’ হতেই
মম স্বোপার্জিত উদারতা।
তব তিমিত তট শুষে নেয় মম বেদনা
আর আছে যত নূন্যতা।
তোমার নিনাদ কখনও বা হয় বৈরিতার দূত,
কখনও দুঃখের হেতু।
মঙ্গলৈষী, বিরলে তবু সতত তোমাতেই চাই
বাঁধিতে হৃদয় সেতু।

 

 

সাম্প্রতিক সমাচার
~ফারহানা নাসরীন
আজকাল-
ফেইসবুকের উদার বুকে, তৈরি এসাইনমেন্ট খুব ভাসছে।
তাই দেখে টেক্সটবুক খানি, খুকখুকিয়ে কাশছে।
টেক্সটবুক কয় রেফারেন্সবুককে, তুই তো কাজে লাগলি না।
রেডি মেইডে বাজার সয়লাব, সৃজনশীলতা আর থাকল না।
কারো লেখায় ভিন্নতা নেই, ভিন্নতা কেবল সাজ-নক্শায়।
হরেক রঙের কালির মাঝেই, সৃজনশীলতা শোভা পায়।
কেউ কেউ তো মোস্ট ডিজিটাল, কম্পোজ করে সারে কাজ।
হাতের লেখার কষ্টটিও নেই, বেহুদাই সব নক্শা-সাজ।
এসাইনমেন্টের সূতিকাগার, আজিমপুরের ঐ নীলক্ষেত,
সবার জন্য উদার দরজা, ভালো-মন্দের নেইকো ভেদ।
শিক্ষক করে রূপের যাচাই, হাতের লেখা আর খাতার,
একেক করে সংখ্যা গুনে, এসাইনমেন্টের মোট পাতার।
ছাত্রধনেরা বেজায় খুশি, নো চিন্তা- তো ডু ফূর্তি।
বই কেনার টাকায় কিনে, শার্ট-প্যান্ট আর জামা-কুর্তি।
প্রশ্ন জানা উত্তর প্রস্তুত, কি হবে আর বই ঘেঁটে?
জ্ঞানের পারদ নিম্নগামী, জানার ইচ্ছে তাই বেটে।

 

 

অতি সমাচার
°°°°° ফারহানা নাসরীন °°°°°°
উচিত কথা তিতা অতি
মিথ্যা অতি মিষ্টি,
এক মিথ্যায় ক্ষণে ক্ষণে
হাজার মিথ্যার সৃষ্টি।
অতি কথন বিরক্তিকর
ব্যক্তিত্বনাসের উদহারণ,
অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ
স্পষ্টত এই সমীকরণ।
অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট
প্রচলিত প্রবচন,
অতি বিশ্রামের কুফলেতে
দারিদ্রতায় বিচরণ।
অতি চালাকের গলায় দড়ি
লেখা আছে বাগ্ ধারায়,
অতি পাকে দড়ি ছেঁড়ে
অতি হাসলে পরে কাঁদায়।
অতি বাড়লে ঝড়ে ভাঙ্গে
ক্ষতি হয় ভয়ানক,
অতি ছোট হলে পরে
ছাগলে চাটে নিচু মস্তক।
অতি পাকলে ছোট কালে
ইঁচড়েপাকা কয় তারে,
অতি কথার বাহুল্যতায়
সত্য কথায় রঙ ধরে।
অতি সুন্দরীর বর মেলা দায়
অতি ঘরনির দুঃখের ঘর,
অতি আলস্য আসলেতেই
সকল দোষের হয় আকর।
অতি প্রশংসা তোষামোদি
তৈলবাজদের মূল পুঁজি,
অতি নিশ্চুপ ভয়ের কারণ
পায় না মনের তল খু্ঁজি।
অতি রাগের গতিবেগে
ছিঁড়ে যায় প্রীতির ডোর,
অতি ভালোবাসলে পরে
উল্টো দিকে ফিরায় মোড়।
অতি ভালো ভালো নয়
বলে গেছেন গুণীজন,
অতির গতি বেশি হলেও
মুখ ফিরায় প্রিয়জন।
বি.দ্র.
কিছু অতি হয়ত ক্ষতির
ঘটায় অনেক অনিষ্ট,
অতি হলেও কল্যাণকর
ভালো লোকের ঘনিষ্ঠ।

 

 

হৈমন্তিক বিষন্নতা
~~~~ফারহানা নাসরীন
বর্ষা গত হয়েছে অনেকদিন।
আকাশে এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির
জবরদস্তির নীল চাষ।
ঘাসের ডগায় রাত চুঁয়ানো কষ্টের স্বচ্ছ দানা।
নীপের মস্তক যেন যুবকের মুন্ডানো মাথা,
সরমে মরমে অবনত-স্বয়ং আমি।
জিহ্বার ঘাঁয়ের মত স্মৃতির মলিন পাতায় জমেছে
আজ খসখসে আর ধবধবে সাদা শ্যাওলা;
মনের উঠোনে চিনচিনে ব্যথার ধীর প্রবাহ;
আর কণ্ঠ-কপাটে রুদ্ধতা।
হয়ত নিউরোপেপটাইড হারিয়েছে তার কর্মক্ষমতা।
সুবাসিত অন্নও তাই বিস্বাদের।
ইলিশ আর রুইয়ে নেই কোন ভিন্নতা।
মেলাটোনিন আর খবর রাখেনা অবসাদের।
তাই মনের স্বাভাবিক তাপমাত্রা এখন
ভারসাম্যহীন-নিম্নগামী।
আর বিষাদের পারদ অনেক উপরে।
যেন হিমাংকই আমার কাঙ্খিত প্রিয়তমা।
বিষন্নতা বলে, প্রিয়তমা!
সে আশায় গুড়ে বালি।
শুনে সাধুতা আর মৌনতা হেসে হয় লুটোপুটি।
সাধুতা কয়, আশা আছে বলেই তো বাঁচি!
মৌনতার কথন, তাই তো মূুক হয়ে তোমায় যাচি।
আশ্চর্য!
ভিন্নতা তবু সমবিন্দুগামী ত্রি ‘তা’-র সমভিব্যাহার।

 

 

বৃষ্টিগাথা
—ফারহানা নাসরীন
মেঘ আমাকে বলল এসে,
তার মনে মোর বসবাস।
কেন রে তুই অভিমানে
একটুতেই ঝরে যাস?
আমি বললাম, করবটা কী?
আঘাত কেন দিস?
ব্যথার কালো কষ্টে কেন্ তুই
মুখখানা ঢাকিস?
আমার ওসব ভাল্লাগে না
বরফ কঠিন বুক,
আমার কেবল ভালোলাগে
নরম শুভ্র সুখ।
যখন তোর শার্ট আকাশ-নীল
আর বকের পালক ধুতি,
আমার তখন নীল শাড়ি গায়
গলায় জোৎস্নার মতি।
রূপোর বরণ সফেদ গায়ে
কালো চাদর যেই,
আমি তখন অভিমানে
হারিয়ে ফেলি খেই।
আমার বুঝি কষ্ট হয় না
বিয়োগ ব্যথার জন্য?
ঝরে গিয়েই খালাস করি
কষ্ট নামের পণ্য।
মেঘ বলল, পাগলি আমার
কষ্ট কেন্ পাস মিছে?
কালোর আড়ে’ই আলোর চলা
সদায় পিছে পিছে।
বিষন্নতার খয়েরি জামা
পরতে করিস মানা,
কষ্ট বিনা সুখের পরখ
হয় কি কভু জানা?
অল্পতে তুই যখন তখন
কান্না হয়ে ঝরিস,
ব্যথার বুকে পাথর হয়ে
বসতেও তো পারিস।
বুঝতে না’রি কেন যে তুই
অবুঝপনা করিস,
নিজের বুকে দহন নিয়ে
ছটফটিয়ে মরিস।
মনে মনে বলি তখন,
বুঝবি না রে মেঘ।
বৃষ্টি হলে বুঝতি তবে
পতনের কত বেগ!
কষ্ট আর যা নিয়েই হউক
আকাশেতেই তো ভাসিস,
লক্ষ ফোটায় টুকরো হয়ে
ঝরতে কি তুই পারিস?
তোর কষ্টের ছদ্মনামে
তাই তো আমি ঝরি,
পতনেরও ব্যথা থাকে
বুঝাই কেমন করি?

 

 

কৌঁসুলির তপশ্চর্যা
——-ফারহানা নাসরীন
তখন কেবল বটের পাতার ঝুনঝুনুনে বিকেল।
মৃদু আর বেগবানের মাঝামাঝি
মনকেমন করা উতল নভস্বান।
আমি তখন উড়ুক্কু মাছ।
জল-হাওয়া দুটোর উপরই আমার সমান অধিকার।
যা দেখি, যা ভাবি তার সবটাই ভালোলাগার।
বিকেলটা যেন দিনের যৌবন।
কোথাও সুখ নেই, আবার সবটা জুড়েই সুখের পশরা-
বাতাসের মত। যেন কৈশোরে আল দেয়া জমির
শুকনো মেটো পথে দৌঁড়োনো সুখের ব্যথা।
সেই বয়সটায় একজন বলেছিল,
“জীবনকে ভোগে বেহুশ করো না, উপভোগ করো।
জলে পায়ের সাথে মনও ভিজিও,
শুধু উত্তাপ নয়- আগুন থেকে নিও উষ্ণতা।
পাতার সবুজে গড়ো হৃদয়ের বসতি –
কেবল জ্বালানি নয়, পাতায় বানিও বাঁশরিও।
সে আরও বলেছে,
প্রাসঙ্গিক আর ন্যায্য রাগ বেঁধে দিও কচ্ছপের পায়ে,
অনুরাগের স্থায়িত্ব হয় যেন হাওয়াই মিঠাই।
ছায়ার দৈর্ঘ্য মেপে মেপে করে নিও জীবনবীমা।
যেটা যা, শুধু সেটাই দেখো না,
গহিনের পথে জ্বালিও জ্ঞানের বাতি।
সত্যে হইও ব্রত, মিথ্যায় আপোষহীন।”
সেই থেকে আমার ডাইনিং-এ বিড়াল, ইদের বাজেটে পাতাকুড়োনি আর বার্গারে বসে যায়
ফুটপাতের ছেলেপুলের অধিকার।
সঞ্চয় যা তার সবটাই সমুদ্র, পাহাড় আর ঝর্ণার।
এখন আমি গাছের গুড়ির আকিঁবুকিঁতে দেখি
কোন ষোড়শীর অবয়ব।
দেহের বক্রতায় বিভক্ত করি না মানুষের-
কে নারী, কে পুরুষ?
রাগ-অনুরাগের সেই অমোঘ বাণী
আমি অক্ষরে অক্ষরে হয়ত নয়,
বাক্যে বাক্যে করি মানি।
আমি ঘুরে দাঁড়াই, মুষড়ে পড়ি না।
পতাকার দণ্ডের মত দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হই মিথ্যের।
শিঁয়াকাঁটার মত নত হই সত্যের পদতলে।
আমি ডরি না রক্তচক্ষু, নড়ি না সত্যের পথ ছেড়ে।
আমি মিথ্যার মুখোমুখি হই শাহাবাগে।

 

 

আমরা যখন মানুষ ছিলাম
—ফারহানা নাসরীন
মেয়ে মানে মায়ের আদল
বোনের মিষ্টি মুখ,
মেয়ে মানে একান্তের বঁধু
প্রেমিকার আরাধ্য চোখ।
মেয়ে মানে বাসের সিটে
নিজের আসন ছাড়া,
মেয়ে মানে সাকোঁর পাশে
নির্ভরতার হাত বাড়া।
মেয়ে মানে পথের সন্ধ্যায়
এগিয়ে দেয়া বাড়ি,
মেয়ে মানে আগলে রাখা
সম্মানিত নারী।

 

 

সাঁওতাল মেয়ে

——–ফারহানা নাসরীন
তুমি এখন অন্য পাখি, অন্য সুরে গাও।
তোমার নৌকো উজান চলে
যুগল বৈঠা বাও।
ঘর হয়েছে, বৌ হয়েছে সেসব আমি জানি।
আদর করে নাম রেখেছ
টুপুর মৌরানী।
তোমার নাকি আসন-বাসন ঘরভরা টুপটুপ।
হাতে ঘড়ি, মোটর গাড়ি
আনন্দ তাই খুব?
বৌদিও নাকি ঘষামাজা ঠিকঠাক সুন্দর।
এখন নিশ্চয়ই লুকাও না পরিচয়
দেখা হলে বন্ধুর?
আমায় তুমি ডাকতে সদায় কৃষ্ণকলি বলে।
প্রথম দিকটায় কষ্ট পেতাম
ভিজাতাম বুক জলে।
বলতে আমায় পাগলী একটা, মারব কিন্তু জোরে।
তুই তো আমার কালো মানিক
ডাকি আদর করে।
তুলোর মতন নরম নরম আদুরে সে সব কথা।
আঁচল ভরে কুড়িয়ে নিতাম
মনের মধ্যে গাঁথা।
কাজল পরিস, নথ খুলিস না মানায় তোকে বেশ।
আঁচড়াবি ঠিক, রাখবি খোলা
দীঘল কালো কেশ।
সেদিন থেকে কুপির কালি ঝিনুকে পাতি রোজ।
চুড়িওয়ালি আর লেইস ফিতার
রাখতাম খুব খোঁজ।
সে সময়টায় আয়না-কাকই, আলতা রাঙা পা।
বাঁকা হাসত পড়শী যেমন,
বকত তেমন মা।
সপ্তাহ শেষে বিসুধবারে আসতে তুমি বাড়ি।
বুকের ভিতর হাজার চড়ুই
সুখের কাড়াকাড়ি।
কালি বাড়ির ঘাটটা তখন আমার আপন ঘর।
এ পথ দিয়েই আসতে তুমি
নিত্য বরাবর।
চ্যাপ্টা নাকের কৃষ্ণবর্ণা সাঁওতালী এই আমি।
কত্ত ভালোবাসি তোমায়
জানে অন্তর্যামী।
ফাগুন মাসে আগুন রাঙা কৃষ্ণচূড়ার বুক।
অপেক্ষারি প্রহর গুনে
ভেজাতাম দু’চোখ।
এ সপ্তাহে আসোনি বাড়ি চিন্তা হচ্ছে খুব।
কু ডাকছে কেন মনে মধ্যে?
করছে বুক ধুপধুপ।
ফের সপ্তায় আসলে বাড়ি অন্যরকম সাজে।
বললে, টুসু বৌ দেখে যা
যাসনে এখন কাজে।
টুসু নামটা কানে বাজল, আঘাত লাগল খুব।
কৃষ্ণকলি নইকো আর!
মিথ্যে বচন সব?
মুক হলাম মুখোশ দেখে, বন্ধ হল শ্বাস।
মনের মধ্যে টর্ণেডো আর
চোখে জলোচ্ছ্বাস।

 

 

বিশ্বাস অতঃপর সে
ফারহানা নাসরীন
২২.০৯.২০১৭ খ্রি:
বিন্দু বন্দু ক্ষণ পেরিয়ে
যাচ্ছে জীবন খুব,
দুঃখের চিকন মালাগুলো
জড়িয়ে আছে বুক।
ছিঁড়তে গেলে যায় ছড়িয়ে
সারা সংসারময়,
তাই তো তারা খুব নিরবে
সংগোপনে রয়।
ঢেকে রাখা চারা যেমন
কুণ্ডলীকার হয়,
তেমনি করে মন মাঝারে
দুঃখ জমা রয়।
বিশ্বাস যদি মিলায় বস্তু
হারানোর কেনো ভয়?
রক্ত মাঝে রোপেছি বিশ্বাস
তবুও হয়েছে ক্ষয়।

 

 

করোনার ছোবল
-ফারহানা নাসরীন
বছরটা খুব অন্য রকম- দুই হাজার বিশ,
ভালোবেসে এখন কেউ আর, নেয় না কোন রিস্ক।
ছোট্ট আবীর, উচ্চতা কম, উদ্দীপনা তার খুব
লাফায়-খেলে, গাছে চড়ে থাকে না একটুও চুপ।
মা ডাকে তার আদুরে গলায়, বাইরে যাস না ওরে,
ট্যাবটা নে বাপ, মোবাইলটাও তবুও থাক না ঘরে।
আবীরটা খুব অবাক হয়, শুনে মায়ের কথা,
সেইদিনও তো দিত বকা, ধরলে তার কোন একটা।
আবীর তখন ভাবতে বসে, মতলবটা কী মায়ের?
গোসল করাবে ঘষে মেজে, ছাল তুলে তার গায়ের?
নাকি আবার পড়তে বসাবে, আটকে রেখে ঘরে?
সাত-পাঁচ না ভেবে সে, দৌঁড়ে পালায় জোরে।
যাস্ নে বলে ছুটে মা পেছনে, তার পেছনে দিদুন,
মুহূর্তেই সে পার হয় গলি, দৌঁড় দিয়ে তিন গুণ।
এ্যাজমা রোগি বুড়ো দিদুন, সদায় বিছানাবাসী,
আজ যে দিদুন দিদির মতন, দৌঁড়োলো ভুলে কাশি!
সেখানেও সে অবাক, বিস্ময়! রাশেদ, তমাল কই?
এইখানেতেই তো আসার কথা, রেখে খাতা-বই।
প্রায় শূন্য পাড়ার গলিতে চলছে কচিৎ লোক,
চিনতে পারে না আবীর ওদের, মাস্কে ঢাকা মুখ।
দোকানগুলোতে রশির বেড়া, চকলেটের বয়াম দূরে,
বয়াম পানে হাত বাড়াতেই দোকানি হায় হায় করে।
আবীর বলে, দোকানি চাচা, পয়সা তো আমি দিচ্ছি!
তা তো দিবিই কিন্তু এখন তিন ফুট দূরে থাক, পিচ্ছি।
এমনটি তো হয়নি কখনও, কী হল আজ সবার?
মা সাধে মোবাইল-ট্যাব! ভাবে সে কয়েক বার।
মন খারাপের কালি মেখে ফিরল আবীর ঘরে,
মায়ের বকা, দস্যি ছেলে, বোঝায় কে রে তোরে?
টিভিতে তো দেখিস না খবর, সারাদিন শুধু কার্টুন,
করোনায় তোকে ধরলে পরে, বুঝবি মজা তখন।
আবীর ভাবে করোনা আবার কে, ডাইনি-পেত্নীর কেউ?
এর নাম তো শুনিনি কখনও, মনে প্রশ্নের ঢেউ।
মাকে বলতে ভয় লাগছে, তাই গেলো দিদির কাছে,
দিদি বলে হাত ধুয়ে আয়, করোনা থাকে পাছে।
করোনা কে গো, ভূতের মাসি নাকি পেত্নীর পিসি?
এর আগে তো শুনিনি নাম, বলছ কী মিছেমিছি?
দিদি বলে বোকার হাড্ডি, জানিস না কি তুই?
কোভিড-১৯ আর করোনা একই, নামেই শুধু দুই।
চীনে জন্ম তার বৃদ্ধি সেখানেই, এখন বিশ্ব ভ্রমণে,
আমাদের দেশেও এসে পড়েছে, চড়ে কোন বিমানে।
ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার মত, একবার ছুঁতে পারলেই মারা,
তবে, বেঁচে যায় স্বাস্থ্যবিধি মানা সচেতন ব্যক্তিরা।
স্বাস্থ্য বুঝি, বিধি কি গো? কও না একটু বুঝিয়ে,
আমার যে বড্ড ভয় হচ্ছে, বল তো সোজাসুজিয়ে।
প্রয়োজন ছাড়া বের হবি না, যেতে হলে মাস্ক পরবি,
নাক-মুখ-চোখে হাত দেয়া মানা, দিলে কিন্তু মরবি।
কোন কিছু ধরলে পরে, হাত ধুবি সাবান পানিতে,
বিশ সেকেন্ডের কম ধু’লে পরে, থাকতে পারে তা হাতে।
স্কুল বন্ধ, টিউশন বন্ধ, পড়া-লেখার নেই কোন চাপ,
আবীর তো মহাখুশি, করোনাকে যা-ই বলুক মা-বাপ।
দিন চলে যায়, মাস চলে যায়, বন্দী জীবন তার,
বাবাও বন্দী তারই মতন, নেই তার রোজগার।
এক সকালে চোখের জলে মা গুছায় জিনিসপত্র,
দিদিকে বলি, কি ব্যাপার? ছাড়তে হবে ঘর অত্র?
বাবার যে এখন কাজ নেই রে, ঘর ভাড়াটাও বাকী,
ঘরখানা তাই ছাড়তে বলেছে বাড়িওয়ালি কাকি।
পাশের বাসার চাচার হাতে, মা তুলে দেয় টিভি,
ধমকে বলে, ধরে আছিস কেন, রিমোটটা তো দিবি?
মোবাইল-ট্যাব পানির দামে, কিনে নিল অন্যজন,
হুহু করে উঠল কেঁদে, ছোট্ট আবীরের মন।
কি কারণে যেন দিদির গালে, চড় মেরেছে বাবা,
বাবার এমন রাগের মূর্তি দেখেছে কখন কে বা!
হঠাৎ তখন বাবার ফোনে বেজে উঠল রিংটোন,
বাবা বলল, সরি, ম্যাডাম। বাসা ছাড়ছি এখন।
অনলাইন ক্লাসে আবীর, পরশ থাকবে না পাপড়িও,
করোনা আমাদের একেবারেই করে দিয়েছে নিঃস্ব।
বহুদিন হয় ঘর বন্দী, হাতে নেই কোন কাজ,
স্মার্ট মোবাইল, ট্যাবটিও যে বেচে দিতে হল আজ।
এখন শুধু বাঁচার লড়াই নিজের সাথে নিজের,
করোনাকে তাই তুচ্ছ মানি খুঁজতে থাকি কাজের।
বেঁচে থাকলে আসব ফিরে, এখন যাচ্ছি গাঁয়ে,
ফিরে এসে প্রণাম থাকবে আপনার পুজ্য পায়ে।
কি বলব আর কি সান্ত্বনা এই করুণ আকুতির কাছে?
বিধি তুমি করোনা তুলে, নিয়ে যাও আমায় ওদের মাঝে।

 

 

 

মরুজাহাজ
—-ফারহানা নাসরীন
এইখানে নদীটি ছিঁড়ে দু’ভাগ হয়েছে।
মাঝখানে তার হাহাকারের সাহারা।
জোনাকি কিংবা নিয়ন বাতি কোনটাই এখানে জ্বলে না।
কুঁজো পিঠ, সরু পা আর গলায় কিঞ্চিৎ সঞ্চিত জল নিয়ে
ক্লান্ত পায়ে হাঁটা অভিযোজিত মরুদ্বিপ-এই আমি।
এটা ফিনিক্স ড্যাকটিলিফেরার সামরাজ্য ।
স্বর্ণলতা বধুর মত গলা জড়িয়ে আদর করেনা এখানে।
হাত-পা বিহীন, মাংসাশী, বর্ণিল আর দীর্ঘ সরীসৃপের বাস- কুৎসিত টিকটিকির নয়। ঐ টুকুই জানতাম।
দ্রাক্ষার মত স্বচ্ছ রস আকণ্ঠ জুড়ে ছিল তার।
আমি ভেবেছিলাম সুধা।
নির্ভয়ে তাই বালিয়াড়ির ঢেউয়ে খেলেছি লুকোচুরি খেলা।
সহসাই বেরিয়ে এলো সেগুন পাতার মত প্রশস্থ ফণা।
দ্বিবীজপত্রী বীজের অংকুরিত সদ্য গজানো পাতার মত জিহ্বা বেয়ে বেরিয়ে এক ঘন-তরল শারাব।
তার চোখে ছিল আমাকে প্রয়োজনের ছবি।
হা খোলা নয়নে দেখলাম তার প্রকৃষ্ট রূপ, অভিব্যক্তি।
মুহূর্তে আমি সম্বিৎ হারিয়ে ছিলাম ঠিক।
গুছাতেও তেমন ব্যয় হয়নি সময়।
ছোবল মারার আগেই যেন আমি উসাইন বোল্ট।
দৌঁড় দৌঁড় দৌঁড়…..
পিছন ফিরে বার এক দেখেছি তাকে-
নিজের অপারগতার উপর তার সেকি ভয়ংকর ছিন্নভিন্ন রাগ!
আমি বাঁচলাম, অনেক কিছু বুঝতে পেরে বাঁচলাম।

 

 

বর্তমান বৈগুণ্য
——ফারহানা নাসরীন
তুমি যদি আপন ভেবে
ধরিয়ে দাও কারো ভুল,
আত্মবোধে লাগলে পরে
ফুটাবেই তোমায় হুল।
কাউকে যদি ভালোবাস
তোমার প্রাণের অধিক,
বুঝতে পারলেই ভাব দেখাবে
যেন ঐশ্বরিয়া/হৃত্বিক।
যেচে করবে উপকার?
তাতেও নেই নিস্তার ,
সন্দেহের তীরসমূহ
ঘাড়ে করবে বিস্তার।
কথা কম, কাজ বেশি
মান যদি এ নীতি,
ভাববে, তুমি দিচ্ছ ফাঁকি
কাজে নেই কোন প্রীতি।
ইয়েস স্যার, জি জনাব,
মহাশয়ের ইচ্ছে,
এরকম তেলবাজি
করতে পারো খিচচ্ছে।
কাজ যদি কমও করো
মুখে যদি ফোটে খই,
তোমার গতি রোধে কে বল?
সত্য কাঁদুক যত-ই।
বিনয়াবনত হও যদি
তব অভ্যাসবশত,
দূর্বল ভাববেই জেনো
এ কথা শাশ্বত সত্য।
প্রতিহত করো যদি
অন্যায়কারীকে,
হাততালি পাবে ঠিক
পাশে পাবে না কাউকে।
উচিত কথা বলা ভালো
এ কথা তো সত্য,
টাকা আর ক্ষমতায়
বিকোয় তা অদ্য।
অন্তরে বিষের হাড়ি
মধু মাখ স্বরেতে,
হয়ে যাবে প্রিয়জন
বাহিরে ও ঘরেতে।
সাতেপাঁচে নয় কারো,
একা চাও থাকতে?
খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কইবে কথা
ধৈর্য পারবে না রাখতে।
কেমন করে বাঁচবে বল
চাটুকারের এই ভীড়ে?
যে যাই ভাবুক খিল এটে দাও
তোমার সত্য নীড়ে।

 

 

একটি রাবার গাছ ও কলম পদ্ধতি
ফারহানা নাসরীন
তারিখঃ ২৪.০৭.২০২০ খ্রিঃ
স্থানঃ শান্তিবাগ।
দীর্ঘদিন আলো, জল, বাতাস দিয়ে
যে এগিয়ে দেয় পূর্ণতায়,
সে-ই একদিন শীর্ষপ্রকটতা রোধের অজুহাতে
ছেঁটে দেয় মুণ্ডুকে।
এমনই একজন আমি বাঁচাও বাঁচাও চেঁচিয়েছি কতবার!
কেউ শোনেনি, তুমিও না।
অথচ তোমার নিঃশ্বাস তখনও আমার অলক ছুঁয়ে
ঘাড় অবধী গড়িয়ে পড়ছিল।
ততটা কাছের ছিলে তুমি, ততটা অন্তকুহরে।
তখন আমার দু’চোখ চুঁইয়ে গলে গলে পড়েছে
শুভ্র কষ্ট। তুমি আমার সেই সব কষ্ট জড়ো করে
মহানন্দে উনুনে চাপিয়েছ কড়াই।
আমি চিৎকার করে বলেছি, বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও!
কেউ শোনেনি, তুমিও না।
আমি এখন পরিশোধিত এবং স্থিতিস্থাপক। মানিয়ে নিয়েছি বেশ।
অনেকের কাজে লাগি, আসি বেশ উপকারে।
অথচ আমার কষ্ট ধু’তে আসেনি কেউ,
না তুমি, না সাগরের ঢেউ।
হঠাৎ একদিন তুমি হে প্রাণনাথ,
ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে নিলে
আমার ঘাড়ের কাছের মধ্যবয়সী হাতটিকেও।
সেদিনও আমি বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করেছি!
কেউ শোনেনি, তুমিও না।
বেশ কিছুদিন পর, তুমি কোথা থেকে একটা গোলাপের হাত এনে আমার রক্তাক্ত হাতের মধ্যে গুঁজে দিলে।
আমি আৎকে উঠে ক্লান্ত দেহে আবার নব্জ্যু হলাম।
আমার জমে থাকা শুস্ক-রুক্ষ কষ্ট আর গোলাপের কোমলতা
যেন কিছুতেই যুগল বন্দি হতে পারছিলনা।
দিন যায়, রাত যায়। তবুও আমরা একই অঙ্গে আলাদা।
একদিন “উৎসর্গ” নামক এক বুড়ো আমার ঝাকড়া চুলে উঁকুন হয়ে এলো।
তার হাতে পুরোনো হয়ে যাওয়া হলদে কাগজের একটা স্ক্রিপট। বুড়োর পাঠ বিবেকের। সারাদিন ধরে চলে বুড়োর রিহার্সেল। অতঃপর গোলাপের শান্ত হাত ক্রমশ আমার আপন হল।
আমার সফেদ কষ্টের আদ্রতায় আর
তোমার অভিযোজনের নিরন্তর সেচে (আলো-জল) একদিন
আমাদের ঘর আলো করে এলো জুনিয়র গোলাপ।
প্রাণনাথ, সেইদিন তোমার চোখে মুখে ছিল-
সেকি আনন্দ আর সার্থকতার তৃপ্তি!
আমি খুব করে চেটেপুটে অনুভব করেছি
তোমার তৃপ্তির সম্পূর্ণটা সুখ।
তুমি যখন আমাদের জুনিয়রকে
আদর করে চুমু খাচ্ছিলে-
তখন আমার শিরা-উপশিরায়
যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গিয়েছিল।
যে বিদ্যুৎ আহত করে না, আরোগ্য করে- থেরাপির মত।
আজ তোমার বা তোমাদের প্রতি আমার আর
কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন অনুযোগ।
শুধু একটা আবদার,
গোলাপের হাত যেন কোন গোলাপের হাতেই থাকে,
রাবারের হাত রাবারে।